স্বাধীনতার পর রাজধানী ঢাকার বড় বড় গার্মেন্টসের ঝুট কিনে এনে বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার নসরতপুর ইউনিয়নের শাঁওল গ্রামে সুতা তৈরি শুরু করেন কয়েকজন উদ্যোক্তা। এই গ্রামটিকে বর্তমানর ‘ঝুটপল্লী’ হিসেবেও পরিচিত ।
এরপর গত ৫৪ বছরে বিকশিত হয়েছে শাঁওলের সুতা বাণিজ্য। আর এখানকার শ্রমিকরা ঝুট থেকে সুতা বের করে এসব সুতা দিয়ে তৈরি হচ্ছে কম্বল, চাদর, শালসহ বিভিন্ন পোশাক। তবে আগে সুতা উৎপাদনে পুরাতন তাঁতের ব্যবহার করা হতো এখন ব্যবহার হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি। আর এ সুতা দিয়ে কম্বল, চাদর, শালসহ বিভিন্ন পোশাক তৈরি করে চলেছে। এর ফলে শুধু শাঁওল গ্রামের পাশাপাশি ৭৫টি গ্রামের প্রায় ১০ হাজার পরিবারের মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। শিল্পটি এলাকার বহু মানুষের দারিদ্র্য দূরীকরণে যেমন ভূমিকা রাখছে তেমনি সৃষ্টি করছে অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা। তাছাড়া এ শিল্পের তৈরীরকৃত সুতা দেশের চাহিদা মিটিয়ে বর্তমানে ভারত, নেপাল ও ভুটানেও রপ্তানি হচ্ছে। এমনকি, বছরে বাণিজ্য হচ্ছে এক হাজার কোটি টাকার বেশি বলে বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সহজ শর্ত ও স্বল্প সুদে ঋণ পেলে সুতা ব্যবসা আরও বাড়বে। আর উদ্যোক্তাদের সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস বিসিক কর্তৃপক্ষের।
এ পেশার সাথে জড়িত সোলায়মান আলী নামের একজন ব্যক্তি আলাপচারিতা কালে তিনি বলেন, সে ফেরি করে গামছা বিক্রি করে আসছিল। এর এক পর্যায়ে বিগত ১৯৮২ সালে একদিন ঢাকার মিরপুর এলাকায় রাস্তার পাশে পোশাক কারখানার ফেলা বর্জ্য তথা ঝুট কাপড় তার চোখে পড়ে। তখন তিনি কয়েক বস্তা ঝুট কাপড় নিয়ে আদমদীঘির গ্রামের বাড়ি চলে আসেন।
বাড়িতে এসেই ঝুট কাপড় থেকে সুতা খুলে নেন। সেই সুতা দিয়ে হস্তচালিত তাঁতে তৈরি করা কিছু মাফলার বাজারে দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়। এরপর তিনি ঢাকার মিরপুর ১০ নম্বর থেকে ঝুট কাপড় এনে সুতা তুলে নানা রকমের তাঁতপণ্য পণ্য তৈরি করতে থাকেন। তা দেখে এলাকার আরও ৩০ থেকে ৩৫ জন তরুণ তাঁতি ঢাকা থেকে ঝুট কাপড় এনে সুতা খুলে তা দিয়ে তাঁতপণ্য তৈরির কর্মকাণ্ডে ঝুঁকে পড়েন। এরপর থেকেই শুরু শাঁওল গ্রামের এ শিল্পের প্রসার।
ঝুট থেকে তৈরি সুতা দিয়ে চাদর, কম্বল, শাল, মাফলার ও তোষকের কভারসহ বিভিন্ন পোশাক তৈরি তো হচ্ছেই সেই সাথে এখন এসব সুতা থেকে দড়ি/রশিও তৈরি করা হচ্ছে। সুতা উৎপাদনে এখন পুরাতন তাঁতের বদলে ব্যবহার হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি। ফলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এক লাখের বেশি মানুষ এ শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন।
ঝুট থেকে তৈরি সুতা দিয়ে চাদর, কম্বল, শাল, মাফলার ও তোশকের কভারসহ বিভিন্ন পোশাক তৈরি তো হচ্ছে। সেই সঙ্গে এখন এসব সুতা থেকে দড়ি (রশি) তৈরি করা হচ্ছে।
সুতা উৎপাদনে এখন পুরাতন তাঁতের বদলে ব্যবহার হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তির। ফলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এক লাখের বেশি মানুষ এ শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। এ কারণেই শুধু সুতা ব্যবসার ওপর নির্ভর করেই শাঁওইল হাট কেন্দ্রিক গড়ে উঠেছে প্রায় দেড় হাজার দোকান। বর্তমানে প্রতিদিন ঢাকা থেকে বাস ও ট্রাকযোগে অন্তত ১৫ গাড়ি ঝুট শাঁওইলে আসছে।
ঝুট কাপড় থেকে এখানে নানা রঙের প্রায় ৫০ ধরনের সুতা উৎপাদিত হয়। গাইবান্ধার কোচাশহর থেকে শাঁওইল বাজারে সুতা কিনতে আসা ব্যবসায়ী আবদুর রহিম বলেন, এখানকার সুতার মান খুব ভালো। ঢাকা থেকে চাদর কিনতে আসা ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বলেন, মান খুব ভালো, দামও কম। সে কারণে বছরজুড়েই এখান থেকে কম্বল ও চাদর কিনে আড়তে মজুত করি।’
শাঁওইল বাজারের সুতা ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বলেন, সুতা ব্যবসায়ীদের জন্য একটি ভালো হাট সেড খুবই প্রয়োজন। এখানে দোকান বসার জন্য কোনো শেড নেই। সে জন্য ঝড়-বৃষ্টি-রোদে খোলা আকাশের নিচে সুতা ও তাঁতপণ্যের পসরা সাজিয়ে বসতে হয় ব্যবসায়ীদের। এছাড়া যারা সুতা উ’পাদন করে তাদের স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা হলে ভালো হতো।
শাঁওইল বাজারের সুতা ব্যবসায়ীদের সংগঠন তন্তুবায় সমবায় সমিতির সাবেক সভাপতি মোফাজ্জল হোসেন বলেন, ঝুট থেকে তৈরি সুতা এবং তাঁতপণ্য মিলে এখানে বছরে প্রায় হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়। সুতা থেকে তৈরি আমাদের কাপড়ের মান বিশ্ব বাজারে সমাদৃত। এখানকার পণ্য বিপণনে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা দরকার।
আদমদিঘী উপজেলা নির্বাহী অফিসার নিশাত আনজুম অনন্যা বলেন, ‘শাঁওইল বাজারের সুতা ব্যবসায়ী এবং এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে হাটসেড নির্মাণের চিন্তা করা হয়েছে। অল্পদিনের মধ্যে সেটি বাস্তবায়নের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে বগুড়া বিসিকের উপ-মহাব্যবস্থাপক এ কে এম মাহফুজুর রহমান বলেন, সহজ সুদে ৪ শতাংশ ঋণ উদ্যোক্তাদের দেয়া হচ্ছে। উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের সব ধরনের সহযোগিতায় প্রস্তুত রয়েছে বিসিক।