বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:১৩ পূর্বাহ্ন

চলনবিলে মাছ সংকটে শুঁটকি পল্লীর চাতাল গুলো

সাব্বির মির্জা, তাড়াশ / ২২০ বার
আপডেট : সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

দেশের বৃহত্তর জলাভূমি চলনবিলে আগের মতো নেই পর্যাপ্ত পানি। পানি কমে যাওয়ায় দেশি মাছের সংকটে হারিয়ে যাচ্ছে মিঠা পানির শুটকি। এই মৎস্য ভাণ্ডার ঘিরে দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসা শুঁটকি পল্লীতে নেই আগের মতো কর্মচঞ্চলতা। ফলে শুঁটকি তৈরির অধিকাংশ চাতাল ও সরঞ্জাম বেশির ভাগ ফাঁকা পড়ে রয়েছে। এতে বেকার হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে চাতালে কাজ করা বহু নারী ও পুরুষ শ্রমিক।
জানা যায়, চলনবিল অঞ্চলে মৎস্য ভাণ্ডার খ্যাত সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও নাটোরের তিন জেলাজুড়ে বিস্তৃত। এটি দেশের মিঠাপানির মাছের বড় উৎস। এই বিশাল জলাভূমির একদিকে শস্য ভাণ্ডার, তেমনই মাছের বড় যোগান আসে এই চলনবিল থেকে। আর এখানকার হরেক প্রজাতির মাছ ঘিরে চলে এলাকার ভিন্ন এক কর্মব্যস্ততা। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে কর্মতৎপর হয়ে ওঠে এখানকার শুঁটকি পল্লীর চাতালগুলো। এই জনপদের তিন জেলার ৯টি উপজেলার নারী-পুরুষেরা ভোরের আলো ফোটায় সঙ্গে সঙ্গে চলনবিলের শুঁটকি তৈরিতে নেমে পড়ে। মহিষলুটিসহ বেশ কয়েকটি চাতালে দেশীয় পদ্ধতিতে শুঁটকি তৈরি করা হয়। সৈয়দপুর, নীলফামারী, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে যায় এ সব শুঁটকি মাছ। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও শুঁটকি রপ্তানি হয়।
সরজমিন দেখা যায়, হাটিকুমরুল-বনপাড়া মহাসড়কের তাড়াশ উপজেলার মহিষলুটি এলাকার রাস্তার দুই পাশে বিশাল এলাকাজুড়ে বিভিন্ন স্থানে শুঁটকি তৈরির চাতাল। আশপাশের গ্রামের নারী-পুরুষেরা এখানে কাজ করেন। চলনবিলের অধিকাংশ মাছ চলে আসে জেলা-উপজেলা সদরের আড়ত ও বাজারে। সেখান থেকে পাইকাররা শুঁটকির জন্য কিনে আনেন শত শত মণ মিঠা পানির মাছ। শুটকির চাতাল সূত্রে জানা যায়, তাড়াশের মহিষলুটি মাছের আড়ত, চাটমোহর উপজেলার বোয়ালমারি, সিংড়া বাজারসহ বিভিন্ন আড়ত থেকে মাছ ক্রয় করা হয়। এরপর তা পৌঁছে যায় শুঁটকির চাতালে। ভোরের আলো ফোটা থেকে শুরু হয় নারী-পুরুষদের কর্মযজ্ঞ। মাছে লবণ মাখানো, মাপজোখ করা, বহন করে মাচায় নেওয়া, শুঁটকি উল্টে-পাল্টে নাড়া, শুঁটকি বাছাই করাসহ আরও কত কাজ। এ সব চাতালে শোল, বোয়াল, খলসা, টাকি, টেংরা, পুটি, কৈ, শিং, মাগুর, রূপচাঁদা, ডানকোনা, রয়না, বেলে, সরপুটি, ছোট চিংড়ি, বাইম, চাপিলা, চেলাপুটি ও চাঁদা মাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ শুকিয়ে শুঁটকি করা হয়। তাড়াশ উপজেলার ঘরগ্রামের শুঁটকি চাতাল মালিক আবু বক্কার বলেন, সেপ্টেম্বর থেকে জানুয়ারী মাস পর্যন্ত চলবে মাছ সংগ্রহ। বর্ষার পানিতে চলনবিল অঞ্চলে যেসব মাছ বেড়ে ওঠে, সেসব মাছই ধরা হয় এ সময় পর্যন্ত। বর্তমানে চাতালে এ মৌসুমে প্রতিদিন শুঁটকি মাছের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫০ থেকে ৬০ মণ।
চাটমোহরের হান্ডিয়ালের চাতাল মালিক আমিনুল ইসলাম বলেন, গত বছরের তুলনায় এ বছর মাছের উৎপাদন একেবারেই কম। বিল থেকে ধরা মাছের দামও তুলনামূলক বেশি। তবে হিমশিম খাচ্ছেন শুঁটকির দাম নিয়ে। শুটঁকির মোকামে সিন্ডিকেটের কারণে গত বছরের চেয়ে এ বছর মহাজনেরা কম দামে শুঁটকি কিনছেন। ফলে লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে এই ব্যবসা। সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও নাটোরের কয়েকজন শুঁটকি চাতাল মালিকরা জানান, এ বছর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছর ১ হাজার টন। গুরুদাসপুর এলাকার শুঁটকি চাতাল মালিক আলম হোসেন বলেন, ব্যক্তি মালিকানার জায়গা লিজ নিয়ে চালানো চলনবিল অঞ্চলের বিভিন্ন শুঁটকি পল্লীতে বর্তমানে কাজ করছেন কয়েক শত নারী। মাছের আকারভেদে শুঁটকির দাম হয় ভিন্ন ভিন্ন। ছোট আকারের মাছের শুঁটকি প্রতিমণ ১৫ থেকে ২০ হাজার এবং বড় আকৃতির মাছের শুঁটকি বিক্রি হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। চাতাল শ্রমিক আল্পনা খাতুন বলেন, প্রতিদিন একজন নারী শ্রমিকের মজুরি ১৫০ টাকা আর পুরুষের ৩০০ টাকা। তবে এই মৌসুমে শুঁটকি তৈরির জন্য মাছ সংকট দেখা দিয়েছে। াড়াশ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ মোকারম হোসেন জানান, চলনবিলের মাছের শুঁটকির গুণগত মান, সুনাম ও চাহিদা দেশ-বিদেশে। তবে বর্ষা মৌসুমে মা মাছ নিধন, কীটনাশক প্রয়োগে মাছ ধরা, প্রাকৃতিক মাছের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ করতে না পারলে চলনবিলে মাছ সংকট দেখা দেবে। এ বছর চলনবিলে কয়েক দফায় পানি আসা ও দ্রুত শুকিয়ে যাওয়ার কারণে মাছের সংকট দেখা দিয়েছে। গত বছর এ উপজেলা থেকে ১৪৩ মেট্রিকটন শুঁটকি উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে।


এ জাতীয় আরো সংবাদ
কারিগরি সহযোগিতায়: সিরাজগঞ্জ ইনফো